অজ্ঞাতনামা
আহাদ আদনান
বিশাল হলঘরটায় ঢুকলেই গন্ধটা নাকে ধাক্কা মারে। ফরমালিনের গন্ধ। মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের প্রথম দিন, প্রথম মিনিটেই এই অভিনব বস্তুর সন্ধান মেলে। ডিসেকশন হলটায় একটা বড় গর্তে ফরমালিনে চোবানো থাকে কিছু মৃতদেহ। সেখান থেকেই এই গন্ধ ছড়িয়ে দুই চোখ সজল আর লাল করে দেয়।
একটা দেহ ট্রের ওপর তোলা। চামড়া শক্ত হয়ে আছে। কত দিন কোনো সুতোর ছোঁয়া পায়নি। আমরা বলি ক্যাডাভের। আমি অবাক তাকিয়ে থাকি। একা ভাবি, লোকটি কে? ওহ্, এটা তো মৃতদেহ। এটাকে লোক বলা কি ঠিক?
ধীরে ধীরে আমি অভ্যস্ত হয়ে উঠি। যেই হাতে ফরমালিন মাখানো হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ধরতে কুঁচকে যেতাম, আধঘণ্টা ধরে সাবানে হাত ঘষতাম, এখন সেই হাতেই ভাত খেতে বসে যাই। হাতে একটা ছুরি নিয়ে দাঁড়াই ক্যাডাভেরের সামনে। ক্ষতবিক্ষত করার আগে আবার থমকে যাই।
আচ্ছা, এই দেহগুলো মেডিকেল কলেজে কীভাবে আসে? কজনই আর দেহ দান করে। সেদিন পত্রিকায় পড়লাম, পদ্মায় লঞ্চ ডুবে শ খানেক লোক ডুবে গেছে। সবার দেহ পাওয়া যায়নি, যায় না কখনোই। এদের মধ্যেই কি একজন আজ হাত বদলে আমার সামনে? আহারে, বেচারা হয়তো ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাচ্ছিল। লঞ্চের ধারণক্ষমতা কত আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। লোকটা হয়তো ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। কোলে ছোট মেয়ে। কখন একটা ঝড় এসে সব ওলটপালট।
নাকি, লোকটা বাসে করে যাচ্ছিল? পুরো পরিবার মিলে মহাসড়কে জীবন দিয়ে দেয়। হয়তো লাশ নেওয়ার কেউ ছিল না। তাই হয়তো কোনো মর্গে পচে পচে যাচ্ছিল।
অথবা কোনো গুম হওয়া লোক নয়তো। হয়তো আমি চিনতাম একটা সময়। তারপর একদিন হারিয়ে গেলেন। সবাই অনেক কান্না করল। কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না। একদিন কোনো একটা নদীতে একটা লাশ পাওয়া যায়, চেহারা চেনা যায় না। পুলিশের খাতায় লেখা থাকে ‘অজ্ঞাতনামা’।
তালুতে চুল আছে একটা-দুইটা। মুখের মাংস খসে গেছে। দাঁত বের হয়ে আছে। অনেক দিন পানিতে ভিজলে জুতো যেমন হয়, তেমন শক্ত চামড়া। আমি ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। জীবিত হলে ছোঁয়ার আগে অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল। এই অজ্ঞাতনামা দেহের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার উপায় নেই। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে করছে অনুমতি নিতে, কথা বলতে, জিজ্ঞেস করতে, ভাই আপনার নাম কী?
‘এই ছেলে, বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? হাত চালাও। প্রথমে স্কিন, তারপর এপিডার্মিস, এর নিচে ডার্মিস, তারপর...।’
হুম, একটা চাবি জোগাড় করতে হবে। রাতে, খুব রাতে একলা আসতে হবে। তালা খুলব। অন্ধকার হলো, আমি আর এই অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ। খুব আলাপ জমবে তখন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন