গল্প তূষার কন্যার খোঁজে (বদরুন নাহার)
সাতসকালে পথে নেমে লোকটির কথা শুনে আমি চমকে যাই, হার্ড ব্রেক করি, সিটবেল্ট না থাকলে কপাল রক্তাক্ত হয়ে যেত। হাইওয়ে ড্রাইভে আমার গতিবেগ সাধারণত নিয়ন্ত্রণহীন হয়। আর লোকটির কণ্ঠে ছিল ভড়কে যাওয়ার মতো উত্তাপ, সে বলল, ওহ্ মাই গড! আই নেভার ফরগেট দ্য ক্রেজি গার্ল, তুষারকণা দাস এবং তারপর সে আমাকে নিয়ে গেল ৪০ বছর পেছনে! আমার ছোট্ট সবুজ শহরের সরকারি কোয়ার্টারে। বিল্ডিংগুলো সারিবদ্ধ আর তার বাইরের রংটা হলুদ। হলুদ দেয়ালের গায়ের মধ্যে গেঁথে থাকা কাঠের দরজা-জানালায় দিতে হবে সবুজ রং, কে ভেবে দিয়েছিল? জানি না। কিন্তু ওই হলুদ আর সবুজ রং এখনো আমার চোখের মধ্যে ভেসে আছে, মনে মনে আমি ভালোবাসি সবুজ দরজার হলুদ শৈশব!
যদিও তা-ই হওয়ার কথা, লোকটি আমার শহরের, আমরা এক স্কুলে পড়তাম। তাই ঠিক লোকটিকে যেন জানি, চিনি না!
কিন্তু সে তার গল্প দিয়ে গিলে খাচ্ছিল আমার শৈশব। ক্রমেই শূন্য এক অনুভূতি, দূরে নদীর পাড় ঘেঁষে ম্যানহাটনের সুউচ্চ দালান, আমার অনুভূতিতে কোনো ছায়া ফেলে না; বরং মনে হতে থাকে আমার কখনো ছোট চুলে বেণি ছিল না, কুঁচি দেওয়া ফ্রক ছিল না, আমি কেবল দেখতে পেলাম পাঁচ বছরের একটি শিশু রান্নাঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে চুরি করছে টুকরো টুকরো সবজির আগাছা। একটু আগে মা যে উচ্ছিষ্টগুলো গুছিয়ে রেখেছিল। যা বাগানের মাটিতে পুঁতে দেবে, সবজি পচা সারে মায়ের পুঁই চারা বেড়ে উঠবে মালতি লতার দেহের মতো পুরু আর চকচকে লাবণ্যে। বলে ফেলি—আহা, তাহলে মালতি লতাতেই প্রেম?
না না, মালতি লতা নয়! সে তো ছিল প্রতিবেশী নববধূ। ষোড়শী হবে হয়তো। কিন্তু তার বয়স মাত্র ছয়!
শুকনো আর খটখটে হাত, মুঠি পাকিয়ে দুমদাম কিল দিয়ে যাচ্ছিল আমার পিঠে। ও তুষারকণা দাস। কণ্ঠও বিশ্রী রকম কড়কড়ে, বলে, ‘অ্যাই ছ্যামড়া...খেলিস কেন? এসব পটোল-কুমড়ার ছাল কোথায় পাইচ্ছিস অ্যা, আর এই ভাট ফুল...এইডা তো আমার গাছের, এরপর এসব দিয়ে খেলতে দেখলে হাত-পা ভাইঙ্গা হাতে ধরাই দিমু। লুলা কইরা ছাড়মু।’
লোকটি খুব কাতর কণ্ঠে এটাও বলে, জানেন ওই সব জংলি ভাট ফুলের গাছ কারও না, ওগুলো কলোনির কলতলার আগাছা ছিল।
কিন্তু আমার ভাবনার সঙ্গে লোকটির কথার কোনো মিল থাকে না। বলি, তুষারকণা দাস নামের মেয়েরা কখনো এত বাচ্চা বয়সী হয় না। হতে পারে তার বয়স চব্বিশ, ভালো করে মনে করে দেখুন। সে হয়তো আপনাকে অক্ষরভরা কাগজ দুমড়েমুচড়ে ছুড়ে মেরেছিল। আর তাতে ছিল প্রেম!
সে বলে, আমি কখনো কলেজের বেঞ্চিতে থুতনি রেখে কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলিনি। কোনো দিন কোনো নারী আমাকে স্পর্শ করেনি, কেবল তুষারকণা ছাড়া। তুষারকণা আমার পিঠে ভাদ্র মাসে দুমদাম শব্দে ঝরে পড়া তালের মতোই মেরেছিল, তার শুকনো আর হাড্ডিসার হাত মুঠি করে! আর তারপর আজ পর্যন্ত, হ্যাঁ সত্যি, আজ পর্যন্ত ওই তুষারকণাই একমাত্র নারী, যে আমাকে স্পর্শ করেছিল।
আমি তবুও বলি, তুষারকণা আপনার চারুকলা বিভাগের মেধাবী শিল্পী নয় তো?
সে বলে, না, আমি চারুকলা বিভাগে কেবল ক্যানভাস আর রঙের মধ্যে ডুবে ছিলাম, আমার কোনো মেয়েবন্ধু ছিল না।
তার মানে, আপনি বলতে চাইছেন আপনার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই!
তুষারকণা দাস আমার...
আমার সহ্য হয় না, সেই কখন থেকে সে বলে যাচ্ছে বাচ্চা একটা মেয়ের নাম তুষারকণা দাস! আমি দিব্যি দেখতে পাচ্ছি ঘন কালো চুলে ঢাকা মেয়েটি সুতি শাড়ির লম্বা আঁচল দুলিয়েও কেমন চিকন রেখা টেনে ছবি আঁকে! সকাল সকাল রঙিন শাড়ির সঙ্গে ফুল জড়িয়ে চারুকলার বকুলতলায় বসে পৌষের গান গায়। আমি তাকে থামিয়ে দিই, বলি, তুষারকণা আপনাকে মেরেছিল, সে তো আপনার বন্ধু নয়...
লোকটি তখন স্বপ্নদ্রষ্টার কণ্ঠে বলে ওঠে, তুষারকণা আমার বন্ধু হতে পারত! কিন্তু আমার সঙ্গে ওর সেই ছেলেবেলায়ই শেষ দেখা। আমার কেবল ওই শৈশবই আছে, যে শৈশবে একদিন আমি আর তুষারকণা সংসার সংসার খেলতে গিয়ে মাটির হাঁড়িতে রান্না তেলাকচুর তরকারিতে লবণ বেশি হওয়া নিয়ে ঝগড়া করেছিলাম, তুষার আছড়ে সে হাঁড়ি ভেঙে ফেলে, আমাদের সেই সংসার ভেঙে যায়।
আমার লোকটার জন্য মায়া হয়, কবি বিনয় মজুমদারের মতো লাগে, কানে বাজে, ফিরে এসো চাকা। তাকে স্মৃতির আক্ষেপ থেকে মুক্তি দিতে চাই। বলি, আপনার কী মনে হয়? নির্বাচনে কে জিতবে?
সে হয়তো স্মৃতি থেকে বের হতে পারে না। আমি তাকে বেরিয়ে আসার জন্য আরেকটু সহযোগিতা করি। এই যে ট্রাম্পের ঔদ্ধত্য আর হিলারির ই-মেইল কেলেঙ্কারি, মাঝখান থেকে বার্নি স্যান্ডার্স বেচারা আগেই আউট।
তিনি তবুও যেন মেঘাচ্ছন্ন। হওয়ারই কথা, আমরা তখন পেনসিলভানিয়ার পাহাড় ঘেঁষে যাচ্ছি, একেক সময় পাহাড়ের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ টানেলের সাদা আলোয় প্রচণ্ড বিষণ্ন²লাগছিল। সে খানিকটা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করল, বার্নি স্যান্ডার্সকে তো কখনোই দাঁড়াতে দেওয়া হতো না। ওটা তুরুপের তাস মাত্র। আর ট্রাম্প যা বলছেন তা কি আর করবেন? ওগুলো তাঁর রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি, অ্যারোগেন্ট দেহভঙ্গি।
কিন্তু সে তো বলেই যাচ্ছে। ইমিগ্র্যান্টদের তো দেখতেই পারে না, অথচ আমেরিকায় ট্রাম্পের আদি শিকড় খুঁজলে দেখা যাবে কোনো একসময় মাইগ্রেটেড। আমেরিকার বেশির ভাগ প্রেসিডেন্টই তো তা-ই। কেবল কয়েক প্রজন্ম আগে বা পরে।
লোকটি যেন এবার বেশ দ্রুতই কথা খুঁজে পেল। পেনসিলভানিয়ার পথ থেকে আবার সরাসরি বাংলাদেশের মফস্বল শহর ফরিদপুরে চলে গিয়ে—আপনি কি কমলাপুর চৌরঙ্গির লাইব্রেরিয়ান এনায়েত উল্লাহকে চেনেন?
আমি কিছুক্ষণ আবাক চোখে লোকটির দিকে তাকিয়ে থাকি, জেনেছি সে মেধাবী, সিলিকন ভ্যালিতে চাকরি করে! গুগলের চালকবিহীন বাস প্রজেক্টের উচ্চপদস্থ! ভাবছি তাকে কোন জবাবটা দিলে উচিত জবাব হবে।
তবে লোকটি ভেবে নিল যে এনায়েত উল্লাহকে আমি চিনতে পারছি না, অথচ আমার চেনা উচিত! তাই সে আমাকে শনাক্তকরণের বাকি বিষয়ে অবহিত করতে শুরু করল, ওই যে বাইসাইকেলে করে সারা শহর ঘুরে বেড়াতেন, ভীষণ মিশুক, ছড়াও লিখতেন।
আমি আসলে চেনার চেষ্টা করতেই পারছি না, মাথার মধ্যে ট্রাম্পকার্ডের মতো ট্রাম্পের সব বক্তব্য ঘুরছে। আমেরিকায় থেকেও আমি আওয়ামী লীগ-বিএনপির বলয়কে ট্রাম্প-হিলারির বলয়ের সঙ্গে মেলাতে ব্যস্ত।
আর লোকটির—তার যেন আমার উত্তরও প্রয়োজন নেই, একজন শ্রোতা পেলেই চলে। সে বলে যায়, এনায়েত উল্লাহ কিন্তু ফরিদপুরের লোক ছিলেন না, কোথা থেকে যেন মাইগ্রেটেড হয়ে ফরিদপুর এসেছিলেন।
আরে নস্টালজিয়া একটা ছোঁয়াচে রোগ, আমি আর তাকে কোনো চান্স দিই না। যেন পেনসিলভানিয়ার গো-চারণভূমি আর কৃষকের সংগৃহীত শস্যভান্ডারের সুউচ্চ স্টেইনলেস স্টিলের চিমনি আকৃতির গোলাঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ছড়াকার এনায়েত উল্লাহ আমাকে বলল, কী সোনা, আগাথা কৃস্টির বই পড়তে কেমন লাগল। আ-হা, আমার সব মনে পড়ে গেল!
বলি, হ্যাঁ...লোকটা ছিলেন শহরে একা! অথচ সবার সঙ্গে তাঁর খুব ভাব-ভালোবাসা।
আমার উচ্ছ্বাসে লোকটিও এক লাফে পাহাড় মাথায় করে রাখা টানেল পেরিয়ে আরও স্মৃতিমগ্ন হলো। এ রকম পাহাড়ি আর অন্ধকার দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথে আমি আজই প্রথম, খানিকটা গা ছমছম ভাব আমার।
সে বলে, আমাদের শহরের লোকটার কোনো ঘরবাড়ি ছিল না। তিনি আবাসিক হোটেলের রুম ভাড়া নিয়ে থাকতেন। ছেলেবেলায় আমাদের বিষয়টা প্রথমে ভালো লাগেনি, দিনের পর দিন হোটেলে থাকা কোনো ভালো লোকের কাজ না, মফস্বলের আবাসিক হোটেলগুলো থেকে কিছু নোংরা গল্প বেরিয়ে আসত। এমন একজন মাইগ্রেটেড লোক কিনা ফরিদপুর পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়ে বসলেন! আর বড়রা তাঁকে ভোট দিয়ে নির্বাচিতও করেছিল! লোকটা তাহলে ভালোই ছিল, না?
যদিও লোকটি প্রশ্ন করে আমার থুতনির দিকে চেয়ে, আমার ভাবনা হলো গুগল সার্চ ইঞ্জিন আসলেই অদ্ভুত! এই যে লোকটির সঙ্গে পেনসিলভানিয়ার অজানা অরণ্যে যাত্রা করার যোগসূত্র তো ওই গুগলই।
গতকাল ইংরেজিতে সার্চ দিয়ে কিছু প্রডাক্টের খোঁজ নিচ্ছিলাম, আজ আমার ফেসবুকের পাশে কিনা সেই আমেরিকান প্রডাক্টের বাংলা দামসহ অ্যাড! বলি হরি কাকে, টেকনোলজি নাকি পুঁজি? আর ভাবছি, সে কোন ব্যাখ্যা দিতে লাইব্রেরিয়ান এনায়েত উল্লাহর নির্বাচনী ভূমিকা নিয়ে এল। এ তো মনে হচ্ছে জাতে মাতাল তালে ঠিক। আমার কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে সে আবার প্রশ্ন করল, লাইব্রেরিয়ান এনায়েত উল্লাহ এখন কোথায়?
আমি কী করে বলব, সেই কবেকার কথা। বলি, আমি তো সেই কবেই শহর ছেড়েছি।
লোকটি বলে, তবুও আমার আগে তো নয়। আমি তো সেই কৈশোরেই চলে আসি।
আমি ভাবছিলাম, আসলে সেই কবে থেকে লাইব্রেরিয়ান এনায়েত উল্লাহ আমাদের আড়ালে চলে গেলেন? তিনি কি তাঁর বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন? নাকি তিনি আমাদের শহরেই কোনো একদিন মারা যান। মনে পড়ে না। লোকটির অবশ্য সে উত্তরেরও প্রয়োজন নেই—সে বলে, আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর নারী ইংরেজি ম্যাডাম নিলুফার বানু!
এবার আমার প্রসঙ্গটা বেশ সঠিক লাগে, আমাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে স্কুলের গল্প হওয়ার কথা।
সে বলে, নিলুফার বানুর মুখ রাগে রক্তজবা হয়ে থাকত। অত ফরসা মানুষও এর আগে আমি কাউকে দেখিনি।
হ্যাঁ, মনে পড়েছে নিলুফার ম্যাম...। বেশ তরুণ বয়স, কিন্তু নীলপেড়ে সাদা শাড়ি পরতেন! স্নিগ্ধ...
না, ভীষণ ভয়ংকর ছিলেন। লাল চোখ...
কই, আমার তো তা মনে হয় না, ভীষণ মিষ্টি ছিলেন, প্রেমে পড়ার মতো।
সে বলল না, তিনি ভীষণ নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে কথা বলতেন। যার জন্য আমার এইম ইন লাইফ হারিয়ে গেল!
লোকটি আরও বলল, তিনি ক্লাসে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কার এইম ইন লাইফ কী? তখন ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ম্যাডামের কথা শুনে আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কোনো দিন ডাক্তারিবিদ্যা শিখতে যাব না। কেননা তিনি ডাক্তারিবিদ্যা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান দিতে লাগলেন, সেই ক্লাস থ্রিতেই! ভয়ংকর সেই ক্লাস, একটা মৃত লাশ। দেহের একটা একটা করে অর্গান কেটে কেটে কী করে জানতে হবে সব অ্যানাটমি—তিনি নিষ্ঠুরভাবে বলে যাচ্ছিলেন সেসব। তাঁর গল্পে ক্রমেই দৃশ্যত হয়ে উঠছিল মেডিকেল ক্লাস, আমি ক্রমেই ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম, আমার মাথা-চোখ সব নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছিল। ঠিক তখনই চড়ুই পাখিটি এল। আমাদের তৃতীয় শ্রেণির কার্নিশে ছিল চড়ুইয়ের বাসা। বাতাসে সে খড়কুটোর নিচে পড়ে। আমি দৌড়ে ধরে ফেলি—একটা নরম তুলতুলে চড়ুইছানা আমার হাতের মুঠিতে এল। আমি নিলুফার ম্যাডামকে না বলেই দৌড়ে বেরিয়ে আসি। শুধু তা-ই না, আমি দৌড়াতে দৌড়তে কলোনিতে ফিরে আসি, হাতে সেই পাখির বাসা, চড়ুইছানাটা তুষারকণাকে দেব বলে।
এবার আমারও মনে পড়ে অ্যানাটমির ব্যাখ্যা, খুবই ঝাপসাভাবে সেই কথাগুলো, অত ছোট বয়সে জানা বিজ্ঞান তো আর সদ্য জানার মতো না; যেমন ঈশ্বরকণা নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্টিফেন হকিং দর্শনশাস্ত্রকে সমালোচনার মুখে টেনে এনেছিলেন। তবে আমার মনে পড়েছে ওই ছোট্ট পাখির ছানার জন্য আমিও সেদিন আমার এই বন্ধুটির পেছন পেছন দৌড়ে গিয়েছিলাম। কেননা চড়ুইছানাটা আমারও চাই। এখন মনে পড়ছে সবই, এবার লোকটি আমার জীবনের অনেক কাছে চলে আসে, লোকটি বলছি কেন...ও তো আমার বন্ধু অমল।
আমি বলি, হ্যাঁ, সেদিন আর একটু হলেই তো তুই ট্রাকের নিচে পড়তি।
সারা দিন শেষে ও আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলে, তুই ধাক্কা মেরে, মাঠে ফেলে বাঁচিয়েছিলি।
এবার আমি ট্রাকের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসা মুখটা দেখতে পাই, এতক্ষণ যে তুষারকণা দাসকে আমি পাচ্ছিলাম না। সেই তুষারকণা, গলা বাড়িয়ে বলেছিল, ‘ওই ছ্যামড়া...আমরা নতুন পাড়ায় যাই, তুই আমাগের পাড়ায় আসিস কিন্তু।’
আমরা তখন হাইওয়ে ক্যাফেতে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ ফেলে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরি। আমেরিকার বসন্তকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল বৃষ্টি, বাইরের সবুজ প্রকৃতি আরও স্পষ্ট রং নেয় তাতে।
কত বছর পর আমাদের পরস্পরকে ফিরে পাওয়া! ফেসবুকে ও আমার নামটা দেখেছিল আর আমি ওর নাম। পারস্পরিক ফেসবুক আইডির সূত্র ধরে আমাদের আজকের সফর। সারাটা ক্ষণ জানা অথচ বহুদিনের অজানা দুজন, যেন সেই ক্লাস থ্রি থেকে দৌড়ে দৌড়ে আকাশ, তারা, স্কুলের মাঠ পেরিয়ে সিএনবি কলোনির ঘাট পেরিয়ে চৌরঙ্গির পথ ছেড়ে, নিউইয়র্কের অ্যাভিনিউ থেকে পেনসিলভানিয়ার উঁচু-নিচু পথ ধরে এই কফি হাউসে! তুষারকণা দাসের খোঁজে, আমরা শৈশবকে ফিরে পাই, পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকি!
অমলকে জিজ্ঞাসা করি, গিয়েছিলি ওদের পাড়ায়?
নাহ...কোন পাড়ায় গেল তা-ই তো জানি না।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন