থ্রিলার : গল্প
মরিবার হলো তার স্বাদ
শিবব্রত বর্মন
থামের আড়ালে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি আমি। একটা দোতলা বাস স্লো করতেই চট করে উঠে পড়লাম পেছনের গেট দিয়ে। প্রায় ফাঁকা বাস। তবু উঠে গেলাম দোতলায়। বসলাম মাঝামাঝি একটা আসনে।
বাসটা স্পিড তুলছে। জানালা দিয়ে দেখলাম, নিচে ফুটপাতে আরেকটা থামের আড়াল থেকে চারটা লোক বেরিয়ে এল। ছুটতে শুরু করল বাসটার পিছু পিছু। তারপর হাতল ধরে একে একে লাফিয়ে উঠে পড়ল। পেছনের গেটের ছড়ানো প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দম নিল তারা। তারপর তারাও উঠে এল দোতলায়। নিঃশব্দে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসল বিভিন্ন দিকে, যেন কেউ কাউকে চেনে না। আমার সঙ্গে একবারও চোখাচোখি হলো না কারও।
রাত ১২টা পেরিয়ে গেছে। তবু রাস্তাঘাট এখনো সুনসান নয়। তবে বাড্ডা থেকে মোহাম্মদপুরগামী এই শেষ বাসটা প্রায় ফাঁকা। দোতলায় আরও তিনজন যাত্রী বসা। দুজন বৃদ্ধ। আরেকজন হিজাব পরা এক নারী।
ক্যাপ্টেইনস পেরিয়ে বাসটা বাঁয়ে ঘুরতেই টের পেলাম, পেছনে বসা একজন উঠে দাঁড়িয়েছে। ওপরের হাতল ধরে ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে আসছে সে। আমি জানি, এখন বাকি তিনজনও একে একে উঠে দাঁড়াবে। এগিয়ে আসবে আমার দিকে। প্রথমজন কোমরে গুঁজে রাখা একটা হাতুড়ি বের করবে। বাকি তিনজন তিনটা বেসবল ব্যাট। ঢাকায় বেসবল ব্যাট পাওয়া যায়? কে জানে। প্রথম আঘাতটা করবে হাতুড়ি হাতে লোকটা, আমি নিশ্চিত। তারপর বাকিরা। আঘাতের পর আঘাত করতে থাকবে তারা, যতক্ষণ না আমি একটা দুমড়ানো মাংসপিণ্ডে পরিণত হচ্ছি। সামনে বসা মহিলাটা ঘাড় ঘুরিয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থাকবে। একটানা। চোখ সরাতে পারবে না। দুই বৃদ্ধ দ্বিতীয়বার ফিরে তাকাবে না।
আমি তো আসলে এদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, এই মুহূর্তটার জন্য। অনেক হিসাব কষে ফাঁকা একটা বাস বেছে নিয়েছি। বেছে নিয়েছি একটা নির্ঝঞ্ঝাট রুট। মধ্যরাতে একটা দোতলা বাসের সিটে থেঁতলানো, রক্তাক্ত অবস্থায় মারা যাওয়ার চেয়ে রোমাঞ্চকর আর কী হতে পারে? রোমাঞ্চকর ও সুস্বাদু।
কিন্তু কেন ওরা এভাবে আমার দিকে উঠে আসছে, সেটা ব্যাখ্যা করা দরকার।
হাতুড়ির প্রথম আঘাত আসার আগেই পুরো ব্যাপারটা দ্রুত বুঝিয়ে বলতে দিন।
ঘটনার গোড়ায় একটা খাবার কিংবা একটা রেসিপি। বিজ্ঞাপনের ভাষায়, পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবারের রেসিপি। সেটার সন্ধান আমাকে দিয়েছিলেন এক মনোবিজ্ঞানী, তাঁর নাম আমি গোপন রাখছি। আমি তাঁর পেশেন্ট ছিলাম। আমার যে একটা জটিল মানসিক রোগ আছে, সেটার নাম যে বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার, আর সেটা যে একটা ভয়ংকর প্রাণঘাতী রোগ—এই সব কথা আমি তাঁর কাছ থেকে শুনেছি। শুনেছি যে এই রোগে আক্রান্ত রোগীরা অস্থির, পরিবর্তনশীল আবেগের বশবর্তী হয়, একটা শূন্যতার বোধ তাদের তাড়া করে বেড়ায়, জগতের প্রতি একটা অভিমান জমা হতে থাকে তাদের মধ্যে। আর তারা নিজেদের ক্ষতিসাধন করার চেষ্টা করে।
আমার পরপর তিনটা সুইসাইড অ্যাটেম্পট ব্যর্থ হয়েছে। চতুর্থ অ্যাটেম্পটের আগে আমাকে রক্ষা করার একটা মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছিলেন মনোবিজ্ঞানী। তিনি আমাকে বন্ধু মনে করতেন। আমাকে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। একটা ঠিকানা।
চিরকুট পকেটে ঠিকানা খুঁজে হাজির হয়ে দেখি, সেটা একটা খাবারের দোকান। একটা রেস্টুরেন্ট। খুবই আটপৌরে ধরনের। মোগলাই পরোটা, হালিম আর সমুচা বিক্রির দোকান। আর মালাই দেওয়া চা। জায়গাটা শহরের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা। পাশ দিয়ে একটা ফুটওভারব্রিজ উঠে গেছে। সারাক্ষণ শোরগোল। আমি একটা চা আর একটা শিঙাড়া খাওয়ার নাম করে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম, চারদিক পর্যবেক্ষণ করলাম। তারপর কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম। কাউন্টারে মাঝবয়সী ম্যানেজার বসা। গলা ঘেমে তার সাদা পাঞ্জাবি ভিজে আছে।
দাম চুকিয়ে আমি চিরকুট এগিয়ে দিলাম। সেটায় একবার নজর বুলিয়ে বেল বাজিয়ে তিনি ওয়েটারকে ডাকলেন, ‘ওই ক্যারাইম্মা! এনারে নিচে নিয়া যা।’
কমবয়সী এক ওয়েটার এসে আমাকে দোকানের ভেতরের দিকে নিয়ে গেল। হাত ধোয়ার বেসিনের পাশ দিয়ে রান্নাঘরে ঢোকা যায়। রান্নাঘরে ঢুকে দেখি এক কোনায় চুলার পাশ দিয়ে একটা সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে। আমি নিচে নামলাম।
নিচে একটা ঝকঝকে আলোকিত ল্যান্ডিং। তিন দিকে তিনটা দরজা। ওয়েটার একটা দরজায় টোকা দিয়ে আমাকে সেটার সামনে দাঁড় করিয়ে চলে গেল।
ভেতর থেকে কেউ একজন দরজা খুলল। আমি ভেতরে পা রাখলাম।
আমি এখন খুব ক্যাজুয়ালি বলছি বটে, তবে পুরো ব্যাপারটার মধ্যে যে একটা গা-ছমছমে অস্বাভাবিকতা, একটা ফিসফিস লুকোচুরি আছে, সেটা আমার না বোঝার কারণ নেই। আর আমি এমন অনুভূতিহীনও নই যে ওই দরজা দিয়ে ঢোকার সময় টের পাব না, আমি একটা নিষিদ্ধ জগতে পা রাখছি। ওই দরজার চৌকাঠ একটা অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখা।
যে ঘরটার ভেতর আমি ঢুকলাম, এবং যে লোকটা আমাকে সম্ভাষণ জানালেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আমি দেব না। শুধু এটুকু বলব যে লোকটা অত্যন্ত রোগা-পাতলা, আর ঘরটা ডিপফ্রিজের মতো ঠান্ডা।
এক পাশের দেয়ালজুড়ে ওয়ালপেপারে একটা প্রিন্টেড বিজ্ঞাপন। নারকেলগাছে ছাওয়া একটা সমুদ্রসৈকত। আর বড় করে লেখা, ‘স্টিমড পাফার: দ্য আলটিমেট টেস্ট’।
আমরা প্রায় ঘণ্টাব্যাপী কথা বলেছিলাম। লোকটার নাম ডিউক। তিনিই কথা বলে গেলেন। তাঁদের রেস্তোরাঁর আসল ডেলিকেসির বিবরণ দিচ্ছিলেন তিনি। স্বীকার করব, কোনো কিছু আকর্ষণীয় করে তোলার কৌশল তাঁর রপ্ত নয়। তিনি শুরুই করলেন একটা অদ্ভুত প্রসঙ্গ দিয়ে।
‘বান্জি জাম্প দিয়েছেন?’
‘না।’
‘বান্জি জাম্পের আকর্ষণটা কোথায়, জানেন?’
‘জানি না।’
‘আকর্ষণটা মৃত্যুর নৈকট্যে। মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে, মৃত্যুকে ছুঁয়ে আবার ফিরে আসা। শরীরে প্রচুর অ্যাড্রিনালিন নির্গত হয়। প্রতিটা কোষ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। একটা পারফেক্ট গেম।’
‘হুম।’
‘কিন্তু তবু পারফেক্ট না।’
‘কেন?’
‘কারণ, আপনাকে গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে, আপনি মরবেন না। একটা শক্ত ফিতা আপনাকে টেনে ধরে রাখছে। একটা ফেক মৃত্যুভয়। যেন এমন একটা রহস্যগল্প পড়ে শোনানো হচ্ছে, যেটার শেষটা আগেই বলে দেওয়া।’
‘বটে।’
‘আমরা এই ত্রুটি দূর করতে পেরেছি। কিন্তু খেলা নয়, একটা খাবারের আদলে। আ পারফেক্ট ডিশ। স্টিমড পাফার। এখানে এই যে স্লোগানটা দেখুন: দ্য আলটিমেট টেস্ট। আসলে পুরো বাক্যটা হবে: দ্য আলটিমেট টেস্ট অব ডেথ। আপনি মৃত্যুর স্বাদ নেবেন। আপনার জিহ্বার প্রতিটা টেস্ট বাড মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’
‘কীভাবে?’
‘পাফার ফিশের নাম শুনেছেন? শোনেননি? আরে আমাদের পটকা মাছ। জাপানে ওরা বলে ফুগু। সামুদ্রিক মাছ। অত্যন্ত সুস্বাদু। ও দেশে ফুগু ডিশ সবচেয়ে দামি ডেলিকেসি। কিন্তু ফুগু বা পাফার বা পটকা, যা-ই বলুন না কেন, এ মাছের একটা বড় সমস্যা—এরা ভয়ানক বিষাক্ত। বলতে কি, দুনিয়ার সবচেয়ে বিষাক্ত জীব এরা। বিষ লুকানো থাকে এদের পিত্তথলিতে। এ কারণে রান্নার সময় পিত্তথলিটা খুব সাবধানে কেটে ফেলে দিতে হয়। খুব সাবধানে। ক্ষুদ্র পিত্তথলি। কাটতে গিয়ে একটু টাচ লেগেছে কি ফেটে যাবে। আর ফেটে গেলে পুরো মাছটাই বিষাক্ত। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। কয়েক মিনিটে। বলা হয়, গোখরা সাপের চেয়ে দশ গুণ বিষাক্ত পাফার মাছের পিত্ত। এ জন্য বিশেষ ধরনের শেফ ছাড়া জাপানে পাফার ডিশ নিষিদ্ধ।’
‘আপনাদের ডেলিকেসিটা কী?’
‘আমরা মাসে একবার সার্ভ করি স্টিমড পাফার। জাপান থেকে আনা বিশেষ প্রশিক্ষিত শেফ রান্না করে। একটা স্পেশাল ব্যাঙ্কোয়েট। পঞ্চাশটা ডিশ। পঞ্চাশ বিশেষ অতিথি। তাঁদের প্রত্যেকের পাতে একটি করে স্টিমড পাফার। সব কটির পিত্ত নিখুঁতভাবে অপসারণ করা—একটির ছাড়া। একটি পাফার বিষাক্ত। একটির গায়ে মৃত্যুর পয়গাম লেখা। কিন্তু কেউ জানে না, কোনটা সেটা। কার পাতে পড়েছে। লটারির মতো।’
‘এ তো রাশান রোলেট!’
‘এগজ্যাক্টলি। ফলে আপনি যখন খাচ্ছেন, ওয়াইন-সহযোগে, তখন মৃত্যুর সম্ভাবনা পান করছেন আপনি। ফেক নয়। কোনো ফিতা আপনাকে টেনে রাখেনি। আপনার জিহ্বার প্রতিটা গ্রন্থি খুলে যাবে। এক অতিলৌকিক স্বাদ গ্রহণ করবে তারা। এমন স্বাদ, যা কখনো অন্য কোনো খাবারে পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা বলি, সেটা মৃত্যুর স্বাদ এবং একই সঙ্গে জীবনেরও স্বাদ।’
‘কিন্তু একজন সেটা পাবে না।’
‘তার দুর্ভাগ্য। বাট ইট ইজ ওয়ার্থ দ্য রিস্ক।’
‘কোনো আইনি ঝামেলা?’
‘নেই। প্রথমত, পাফার পরিবেশনের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা এখানে নেই। আর দ্বিতীয়ত, একটা দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। আদালতে প্রমাণ করার কোনো রাস্তা নেই এটা ডেলিবারেট ছিল।’
ডিউক আরও দুটি তথ্য দিলেন: প্রথমত, ওই স্পেশাল ব্যাঙ্কোয়েটের দাওয়াতের মূল্য পাঁচ লাখ টাকা। দ্বিতীয়ত, ঘুণাক্ষরেও এই ডেলিকেসির কথা দ্বিতীয় কাউকে বলা যাবে না। বললে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। যেকোনো ধরনের শাস্তি দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর আছে।
তিন মাস পর ডাক পড়ল। আমি ব্যাঙ্কোয়েটের অতিথি। আবার সেই মোগলাই রেস্তোরাঁ। সেই তেল-চিটচিটে রান্নাঘর। সিঁড়ি বেয়ে ভূগর্ভস্থ ল্যান্ডিংয়ে নেমে যাওয়া। তবে এবার আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো একটা বড় হলঘরে। মেঝে উডেন প্যানেলের। স্বল্পালোকিত হলঘরে একটা বিশাল ওভাল ব্যাঙ্কোয়েট টেবিল। অপর অতিথিদের চেহারা ঠিকমতো দেখা যায় না। তাঁরা নানান পোশাক পরে এসেছেন। খদ্দেরের পাঞ্জাবি দেখলাম একজনের গায়ে। এক প্রৌঢ়কে দেখলাম টাক্সেডো পরেছেন। জামদানি পরা এক তরুণীকেও চোখে পড়ল।
সবার কেন্দ্রে ডিউক। খাবার পরিবেশনের আগে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে একটা বক্তৃতা দিলেন। আগেই বলেছি, বাগ্মিতার গুণ তাঁর নেই। বাক্যের গড়ন শিথিল। আর এই নৈশাহারকে নাটকীয় করার বদলে তিনি যেভাবে মানুষের চতুর্থ ইন্দ্রিয়বিষয়ক একটা দার্শনিক প্রসঙ্গের অবতারণা করলেন, সেটা ছিল ক্লান্তিকর। তাঁর বক্তৃতা শেষ হলে আমরা সবাই হাততালি দিলাম। তিনি বসে পড়লেন। আর তখনই প্রথমবারের মতো চোখে পড়ল, তাঁর পেছনে দেয়ালে একটা বড় গিল্ট করা ফ্রেমে লেওনার্দোর ‘দ্য লাস্ট সাপার’।
উর্দি পরা চারজন বাবুর্চি শুরুতে স্টার্টার দিয়ে গেল: দুটো স্ক্যালোপের সঙ্গে স্মোকড বিটরুট আর অ্যাপেল র্যালিশ। প্লেটের এক কোনায় স্পিনাচ আর টামারিলো সালাড।
স্টার্টারের পর্ব শেষ হলে মেইন ডিশ। ঢাকনা দেওয়া গোল থালায় পরিবেশন করা হলো সেটা।
সঙ্গে সঙ্গে একটা কেমন নীরবতা নেমে এল আহারকক্ষে। ছুরি-চামচের টুংটাং থেমে গেল।
আমি ঢাকনা সরালাম। একরাশ সাদা স্টিম লাফিয়ে উঠল, আলাদিনের ঘষা দেওয়া চেরাগের মতো। মাছটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। প্লেটের মধ্যে শুয়ে আছে অপারেশন টেবিলে পড়ে থাকা লাশ যেন। পেটের দিকটা সাদা। পিঠের দিকটা খয়েরি। চারপাশে কিছু গ্রিন ভেজিটেবল আর পামকিন মাফিন। আমি একবার পুরো টেবিলের দিকে তাকালাম। সবাই আড়চোখে তাকাচ্ছে সবার দিকে। হিসাব কষছে যেন।
ডিউকের দিকে তাকালাম। দেখি তাঁর পাতেও পাফার। সবার আগে কাঁটাচামচ চালালেন তিনি। সসে চুবিয়ে মুখে পুরলেন। সেই সঙ্গে একটা শব্দ বের হলো তার মুখ থেকে, ‘উম...ম।’
সেটা যেন একটা সংকেতবার্তা: আমরা সবাই তড়িঘড়ি কাঁটাচামচ তুলে নিলাম হাতে।
খাবারের স্বাদের বর্ণনা আমি দেব না। সেটা বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু বলব, পৃথিবীর কোনো কিছুর সঙ্গে সেটা তুলনীয় নয়। অমৃত বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তবে সেটা তাই। আমরা সবাই খেয়ে যাচ্ছি আর অপেক্ষা করছি—কিছু একটা ঘটার অপেক্ষা। তিন মিনিট পর খটাশ করে একটা শব্দ হলো। একটা চেয়ার থেকে কাত হয়ে কেউ মেঝেতে পড়ে গেছে। আধো অন্ধকারে লোকটার চেহারাটা একঝলক দেখতে পেলাম। তার ঘোলাটে বিস্ফারিত চোখ আমি কোনোদিন ভুলব না।
দুজন বাবুর্চি ধীরপায়ে এসে ধরাধরি করে লোকটাকে নিয়ে গেল। তখনো খিঁচুনি দিচ্ছিল।
ডিউক সাহেবের রেস্তোরাঁয় আমি আরও তিনবার গেছি পরবর্তী এক বছরে। এই চিকিৎসা আমার কাজে দিয়েছে। আমি সুস্থ হয়ে উঠেছি। ফিরে গেছি স্বাভাবিক জীবনে।
এর দুবছর পর একটা ঘটনা ঘটে। একটা জরিপের কাজে দেশের প্রত্যন্ত এক রেলশহরে কয়েক দিন থাকতে হয় আমাকে। একটা মফস্বলি আবাসিক হোটেলে উঠেছি। একদিন শহরের কাঁচাবাজারের ভিড়ে একটা লোকের চেহারা দেখে চমকে উঠলাম। লোকটাকে আমি চিনি। তার ঘোলাটে চোখ আমার চেনা। আমি লোকটার দাফনে যোগ দিয়েছিলাম। তার বিলাপরত স্ত্রীকে দেখেছি আমি।
লোকটা আমাকে চেনেনি।
ঢাকায় ফিরলাম একটা অস্থিরতা নিয়ে। খোঁজ শুরু করলাম। ডিউকের রেস্তোরাঁয় নিহত ব্যক্তিদের ঠিকানা ধরে অনুসন্ধান। আর অনুসন্ধান করতে করতে টের পেলাম, সেই পুরোনো অসুখটা ফিরে আসছে আমার মধ্যে—বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার।
গত সপ্তাহে আমি আবার গিয়েছি সেই রেস্তোরাঁয়, ডিউকের মুখোমুখি হতে। আমার কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি ডিউক। শুধু তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। সেই চাহনিতে কী ছিল, আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি। পরের কয়েকটা দিন আমি অপেক্ষা করেছি। আর সাজিয়েছি আমার নিয়তি।
আজ রাতে এই দোতলা বাসের পরিস্থিতি আমার সাজানো। আমি এভাবেই চেয়েছি। এভাবেই সবচেয়ে সুস্বাদু।
পেছন থেকে আল ধরে এগিয়ে আসছে চারজন। এসে দাঁড়াল আমার পেছনে। আমি জানালায় ফুটে ওঠা ঘোলা প্রতিবিম্বে বুঝলাম, একজন হাতুড়ি বের করেছে।
মাথার খুলিতে আঘাত লাগলে ব্যথা পাওয়ার আগে ‘কড়াৎ’ করে যে একটা শব্দ পাওয়া যায়, সেটা জানা ছিল না।
আমি ব্যাঙ্কোয়েট টেবিলে বসে আছি। আমার সামনে একটা পাফার মাছ। স্টিমড। চারপাশে স্পিনাচ স্যালাড সাজানো।
টেবিলের উল্টো দিকে বসা মনোবিজ্ঞানী, যাঁর কাছে আমি নিয়মিত কাউন্সেলিং নিতাম। ব্যাঙ্কোয়েট রুমে আর কেউ নেই।
আমার মাথার একপাশটা ফুলে আছে। জমাট বেঁধে আছে রক্ত।
‘অনুমান করেছিলাম, এর পেছনে আসলে আপনি আছেন। বিরাট ব্যবসা, না?’
‘প্রতি মাসে আড়াই কোটি’, মনোবিজ্ঞানী জবাব দিলেন।
‘পুরোটাই জালিয়াতি?’
‘ভিকটিমরা সাজানো, এটুকু বলতে পারি। তাদের দূরদূরান্তে রিসেটল করা হয়। পয়সা দিলে রাজি হবে না কেন।’
‘আর ব্যাঙ্কোয়েটের অতিথিরা? সবাই কি আপনার পেশেন্ট?’
‘সিংহভাগ।’
‘তাদের সবার মধ্যে আত্মহত্যার বাতিক আপনিই তৈরি করেন?’
মনোবিজ্ঞানী চুপ করে থাকেন।
তিনি তাকিয়ে আছেন আমার পাতের পাফার মাছটার দিকে। আমি জানি, এই মাছের পিত্তথলি ফেলা হয়নি। রাশান রোলেটে পাঁচবার ট্রিগার টেপা হয়ে গেছে। এটা ষষ্ঠ ট্রিগার। অব্যর্থ।
মনোবিজ্ঞানী শেষটা এভাবেই চেয়েছেন। সবকিছু যে আমার মতো করে সাজানো হবে, এমন তো নয়।
আমি কাঁটাচামচ তুলে নিলাম।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন