খোদার কসম, তোকে খুন করব!
সেলিম হোসেন
ঘুম থেকে জেগেই ভয় পেয়ে গেল জুনুন, তাকে শক্ত করে চেপে ধরে আছে কে যেন, ঝাঁকাচ্ছে! কিন্তু একটু পরেই বুঝল, আসলে তার হাত-পা বাঁধা, আর সে একটা খুব চিপা জায়াগার মধ্যে আছে। ইঞ্জিনের শব্দ কানে এল, আবার ঝাঁকি, দুলুনি...তার মানে, কোনো একটা গাড়ির পেছনে বস্তার মতো করে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে। কোথায়? কেন?
তারপর ধীরে ধীরে সব মনে পড়ল তার।
ইয়াবার একটা চালানের খবর পেয়ে গাবতলীর এক গুদামে একটু খোঁজ নিতে আর কাউকে হাতের কাছে না পেয়ে ওকেই পাঠাল ক্যাপ্টেন নিশা। পইপই করে বলে দিয়েছে বেশি কাছে না ঘেঁষতে, শুধু ব্যাপারটা সত্যি কি না, সেই তথ্যটুকু এনে দিলেই হবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে না খুঁড়তেই যেন কিলবিল করে বেরিয়ে এল সাপ—পেয়ে গেল কাঁচামালের সন্ধান। অর্থাৎ—আশপাশেই কোথাও আছে কারখানা, এখন এ দেশেই তৈরি হবে ইয়াবা। তো, লেগে গেল সে ওদের লেজে লেজে, ফেউয়ের মতো। কিন্তু মিরপুর মাজারের কাছে আসতেই একটা অঘটন ঘটে গেল। বাঁয়ে মোড় নিয়ে রাস্তার পাশের একটা মিস্ত্রির গ্যারেজে ঢুকে গিয়ে নাম ধরে কাউকে ডাকতে ডাকতে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ল চালক, চাকা বদলাবে। অনেকক্ষণ থেকেই বোধ হয় হাওয়া যাচ্ছিল, এখন একেবারে বসে গেছে। চাকার ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি জুনুন, তাই সিদ্ধান্ত নিতে একটু দেরি করে ফেলল সে, কী করবে ঠিক করার আগেই দেখল কাভার্ড ভ্যানের নিচে গাড়ির অতিরিক্ত চাকা ধরে ঝুলে থাকা ওর শার্ট-প্যান্ট পরা ছোট্ট কিশোরী শরীরটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে অধিকতর বিমূঢ় চালক হানিফ, হেলপার বিল্লাল এবং মিস্ত্রি শফি।
ও অবশ্য বলল, ওখান থেকে ওকে নামানোর পর ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করল যে ও আসলে সাভার যাবে, সেখানে ওর বোন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে, পয়সা না থাকলে এভাবেই সে আরও কয়েকবার গিয়েছে। কিন্তু চালক জানে সে কী পরিবহন করছে এবং তার এটাও মনে পড়ল, তার গাড়ি আগাগোড়াই সাভারের উল্টোদিকে মুখ করে ছিল। কিন্তু মেয়েটা মনে হয় সত্য কথাই বলছে, অন্তত চেহারা দেখে তা-ই মনে হচ্ছে। বোকা মেয়ে, ভুল করে একটা ভুল গাড়িতে উঠে পড়েছে।
কিন্তু ওই ভুলের মাশুল তো তাকেই দিতে হবে, তা ছাড়া...আবার তার চালানটার কথা মনে পড়ল। নাহ্, রিস্ক নেওয়া ঠিক হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিল সে, একে এখানে ফেলে রেখে যাওয়া যাবে না। আর, যদি মেয়েটার কথাই সত্যি হয়, তো ক্ষতি কি, আখড়ায় বাড়তি একজন কাজের লোক হলে মন্দ হবে না।
‘চল তুই, আমাগো লগে,’ বলে চুলের মুঠি ধরে মাটিতে বসে থাকা জুনুনকে দাঁড় করাল ড্রাইভার, ‘খাওনদাওনের চিন্তা করন লাগব না।’
আকাশের চাঁদ হাতে পেল যেন জুনুন, সে তো এটাই চায়! রাজি হলো সে, কিন্তু সেটা প্রকাশ করল রয়েসয়ে। আমতা-আমতা করল খানিক, ভান করল যেন সাভারে তার বোনকে খবর দিতে না পারলে সে খুব চিন্তা করবে।
ঠিক তখনই জুনুনের বাড়া ভাতে ছাই দিতে এগিয়ে এল হেলপার বিল্লাল, বেশ খানিকক্ষণ থেকেই ওকে দেখছিল সে আর হাতড়াচ্ছিল স্মৃতির পাতা। এবার ঠিক মনে পড়েছে, চিনেছে সে। ‘ওস্তাদ!’ উত্তেজনায় কাঁপছে তার গলা, ‘আমি চিনি অরে, বহুত বড় পকেট মাইর আছিল উই, শাহবাগে কাম করত। আর আমি তখন বাসের মোদে কাম করতাম।’
‘আইচ্ছা, তাই নিকি? ত্যা-ত্তো বালাই, আমাগোবি কামে লাগব।’
‘না ওস্তাদ, উই অখন পুলিশের লগে ভাঁজ খাইসে, কামকাইজ ছাইড়া দিসে।’
‘অ্যাঁ? সোর্সের খাতায় নাম লেহাইছে?’ সতর্ক হয়ে উঠল হানিফ।
সতর্ক হলো জুনুনও, এখানে যে দফারফা সেটা বুঝে গেছে আগেই। আর একটুও সময় নষ্ট না করে চট করে ঝুঁকে এক গড়ান দিয়ে গাড়ির ওপাশে চলে গেল সে। উঠেই দেবে দৌড়...কিন্তু সামনেই গ্যারেজের মিস্ত্রি। বাউলি কেটে সরে গিয়ে পড়ল সোজা আবার ড্রাইভার হানিফের সামনে, লাফিয়ে ঘুরে আসছিল।
বাঁ হাতে জুনুনের বাহু ধরে টেনে নিয়ে চোখের পলকে ডান হাতের রেঞ্চ দিয়ে সজোরে বাড়ি মারল ওর কানের পাশে।
জ্ঞান হারানোর ঠিক আগ মুহূর্তে মনে মনে জীবনে প্রথম ভয়ংকর একটা ঠান্ডা প্রতিজ্ঞা করল জুনুন—লোকটাকে মারবে সে।
হাত-পায়ের বাঁধনের দিকে মনোযোগ দিল জুনুন, এগুলো কোনো ব্যাপারই না তার জন্য। ছোটবেলা থেকে এই সব করে করেই বড় হয়েছে। সে কাজ শুরু করে দিল। প্রথমে শরীর কুঁজো করে, পিছমোড়া করে বাঁধা হাত দুটো মুচড়িয়ে নিয়ে এল সামনে, তারপর দাঁতের একটু সহায়তা নিয়ে একটা হাত, পরে অন্যটাও ছাড়িয়ে নিয়ে ডলে সচল করে নিল।
তিন মণ ওজনের মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে। হাত দিয়ে দেখল ফুলে আলু হয়ে আছে কানের পাশে মাথার নিচের দিকে। হাত লাগতেই তীব্র জ্বালা ওখানে। আবার কসম খেলো জুনুন, খুন করবে সে লোকটাকে। হারামজাদা এত জোরে মেরেছে...মরেও তো যেতে পারত সে!
উঠে বসে মুরগির মতো করে বাঁধা পা দুটো খুলে হাত বোলাল। জুতা একটা প্রায় খুলে গেছে, ঠিক করে পরে নিল, অন্যটা ঠিকই আছে। বোঝাই যায়, তবুও পকেটে হাত দিয়ে দেখল, ফোনটা নেই। থাকার কথাও না। ফোনটা দামি, তাই যে নিয়েছে, সে ফেলেও দেবে না ওটা, সে ক্ষেত্রে ট্র্যাক করা যাবে।
কতদূর গেল ওরা? কোথায়, কোন দিকে যাচ্ছে? আশুলিয়া হয়ে টাঙ্গাইলের দিকে? নাকি টঙ্গী হয়ে আশুগঞ্জের দিকে? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কতক্ষণ চলেছে বুঝতে পারে নাই। তাই দূরত্ব অনুমান করা যাচ্ছে না। একটু পরেই গতি কমে এল গাড়ির, বাঁক ঘুরল, বোধ হয় থেমে যাবে। দরজায় কোনো ফাঁক নাই, তবুও আবছা একটু আলো আসছে। অনেকগুলো বড় বাক্স প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়ছে, দাঁড়ানো যাবে না। আবার শুয়ে পড়ে যতটুকু সম্ভব হাত-পাগুলো সচল করে নিল নড়াচড়া করে। গাড়ি প্রায় থেমে পড়েছে। দ্রুত পায়ের ওপর একটা দড়ি ফেলে রেখে আর একটা হাতে নিয়ে পিঠের তলায় দিয়ে চুপ করে পড়ে রইল।
গাড়ি থেমেছে। দরজা লাগানোর শব্দ হলো দড়াম করে। পাশেই দাঁড়িয়ে কথা বলছে কারা যেন। আরে, দূরে সরে যাচ্ছে। কেউ এসে দরজা খুলছে না।
আস্তে করে কাত হয়ে উঠে বসল জুনুন, কাঠের বাক্সের কোনায় লেগে ব্যথা পেল। নিচের দিকে কয়েকটা কাঠের বাক্স, পাশে আর ওপরে কাগজের বড় বড় কার্টন। কী আছে ওতে, কে জানে! যতদূর সম্ভব উঁকি মেরে, হাত বাড়িয়ে খোঁজার চেষ্টা করল, জুতসই কিছু পেল না। সম্বল বলতে দুই টুকরো নাইলনের ছোট দড়ি। উহু, নড়তে গিয়ে পড়ে গেল জুনুন, ঘষা খেল কাঠের বাক্সের কিনারায়। আর একটু হলেই চোখে লাগত একটা বাক্স ভেঙে বেরিয়ে আসা কাঠের টুকরোর একটা চোখা মাথা। মাথাটা সরিয়ে ওটাকে দেখল কিছুক্ষণ, তারপর হাত বাড়িয়ে যতদূর সম্ভব বড় করে ভেঙে নিল। বাক্সের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কী আছে বোঝার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। কিন্তু কাঠের টুকরোটা পছন্দ হলো তার, চিকন প্রান্তটা ধরে চ্যাপ্টা মাথা দিয়ে খাড়া করে বাড়ি মারতে পারলে ভালো কাজ হবে। আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে এনে বুকের ওপর রাখল প্রথমে, তারপর পিঠের নিচে লম্বা করে দিল। জায়গার অভাবে নড়াচড়া করতে সমস্যা হচ্ছে। থেমে একটু দম নিল সে।
এই সময় হঠাৎ কথাবার্তা শোনা গেল, এগিয়ে আসছে। শরীরের নিচে কাঠের টুকরোটাকে এক হাতে শক্ত করে ধরল জুনুন, অন্য হাতে দড়ি। কখন আঘাত হানবে সে? দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে? নাকি একটু পরে? ঠিকমতো না খেলতে পারলে কী হবে? ওরা কি তাকে মেরে ফেলবে? মনে হয় না। প্রথমে হয়তো নির্যাতন করবে কথা বলানোর জন্য। তখন? তখন কী হবে? ও কি নিশা ম্যাডামের নাম-ঠিকানা সব বলে দিতে বাধ্য হবে? তিনি এখন কোথায়? এখনো ওর কোনো খবর না পেয়ে কী করছেন?
ভুল হয়েছে, তাড়াহুড়োয় তাঁকে আর ফোন করা হয় নাই। গাড়ির নিচে ঝোলার আগে একটু কোনো রকম সুযোগ পেলে হতো। তার মানে, এখন সে মারা গেলে ব্যাপারটা কেউ জানতেও পারবে না। এসব ভাবতে ভাবতে নিজের মধ্যে একটা সাংঘাতিক জোর পেয়ে গেল সে, মনকে বাঁধল শক্ত করে—যা করার তাকেই করতে হবে।
কিন্তু এবারও কেউ এল না, কাকে যেন হ্যালো হ্যালো করতে করতে আবার দূরে সরে গেল কণ্ঠস্বর এবং পায়ের শব্দ।
—হ্যালো, আপনে কেঠা?
—এই ফোনটা কি আপনার?
—হ, ক্যালেগা?
—জুনুন কোথায়?
—কোন জুনুন?
—এই ফোনটা যার, তার নাম জুনুন, ওকে এটা আমিই দিয়েছিলাম। আমি ক্যাপ্টেন নিশা। নিজের ভালো বোঝেন? বুঝলে এক্ষুনি ফোনটা ওকে দিন।
—ওই পিচ্চিটা? উই নাইক্কা, কাম থুইয়া গেছে গা।
—এখনই ওর সাথে কথা বলতে চাই আমি, এক্ষণ! না হলে...ওর যদি কিছু হয়...খোদার কসম, তোকে খুন করব আমি!
হঠাৎ নার্ভাস বোধ করল, আর কোনো কথা না বলে দ্রুত ফোনের লাইনটা কেটে দিল ড্রাইভার হানিফ। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল, ‘ক্যাপ্টেন নিশা, এইটা আবার কেঠা?’ ভাবনায় পড়ে খাবি খাচ্ছে সে, ‘ডাইরেক খুন-খারাবার মদ্যে গেল গা ক্যান? মালটা তো দেহি হালায় বহুত কড়া মাঞ্জা!’
স্মার্ট ফোনের ব্যবহারকারীও যথেষ্ট স্মার্ট হলে যা হয় আরকি, কথা বলতে বলতেই জুনুনের লোকেশন পেয়ে গেছে ক্যাপ্টেন নিশা। ওই ফোনটা ওরটার সাথে পেয়ারড ডিভাইস করা ছিল আগেই। কিন্তু মাথায় ওর পাগলা ঘণ্টি বেজে চলেছে, সময় নাই...সময় নাই! জানে, এই সব ব্যবসায় জড়িয়ে পড়লে মানুষ কতটা ভয়ংকর নিষ্ঠুর হয়ে যায়, ওরা নিজের লোকদেরই কোনো রকম ছাড় দেয় না, অন্যদের বেলায় তো প্রশ্নই আসে না।
দ্রুত অ্যাকশনে যাওয়ার একটা ভীষণ তাড়া অনুভব করছে নিশা ভেতরে-ভেতরে। তবে খুব ঠান্ডা মাথায় মেপে মেপে সব নিয়ম মেনে পুরোপুরি একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল সে, এই অল্প সময়ে যতটুকু সম্ভব। এক্সপ্লোসিভ ব্যবহারে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, বিস্ফোরণের শব্দে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে। তা ছাড়া সন্ত্রাসী মারতে গিয়ে জুনুনকেও উড়িয়ে দিতে চায় না সে। গোলাগুলি এড়িয়ে চলতে হবে এই দফায়। সঙ্গে নিল অনেক কিছুই, কিন্তু ওসব ছাড়াও কীভাবে এগোনো যায় রাখল সেই ব্যবস্থাও। তারপর রুটিন মেনে নিজের ব্যাকআপ হিসেবে ফোন করল জাকি ভাইয়ের অফিসে।
—না না, দাঁড়ান, পরিষ্কার হলো না। কারা বানাচ্ছে ইয়াবা? আর কোথায় আছে ওদের ঘাঁটি? কোথায় যায় চালান?
—ওসব প্রশ্নের জবাব পরে পাওয়া যাবে। এখন শুধু জুনুন, আর সব বাদ।
—কিন্তু সে এখন কোথায় আছে?
—ওদের বোধ হয় একটা ঘাঁটি আছে, মিরপুর বেড়িবাঁধের পাশে। সেখানে ওদের পিছে পিছে গিয়ে আটকা পড়েছে জুনুন।
—তার মানে, ওদের হাতে ধরা পড়েছে?
—হ্যাঁ। কিন্তু খুব শিগগির বেরিয়ে আসছে সে। আমি এখনই যাচ্ছি সেখানে।
—না, আপনি তা পারেন না। আপনি...
আর কিছু না শুনে শুধু ‘জিএমডি অন’ এ তথ্যটা দিয়ে লাইন কেটে দিল নিশা।
জুনুনের ফোন থেকে পাওয়া লোকেশনটা ম্যাপের ওপর পিন পয়েন্ট করে রেখেছিল নিশা নিজের আই ফোনে, কিন্তু এখন দেখাচ্ছে তার থেকে একটু দূরে অন্য একটা লোকশেন। স্থির। পাত্তা দিল না সে, হতে পারে কোনো পুকুরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে ওটাকে।
গুগল কাজ করে ফোনের মাধ্যমে, তাতে কখনো কখনো পাঁচ মিটার পর্যন্ত অফসেট থাকতে পারে, কিন্তু ওর শরীরে একটা ডিভাইস লাগানো আছে (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম সাপোর্টেড মনিটরিং ডিভাইস, ওরা এটাকে সংক্ষেপে বলে ‘জিএমডি’) সেটা জিপিএস দিয়ে সরাসরি স্যাটেলাইট থেকে ডেটা নিয়ে কাজ করে বলে শূন্য দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত সঠিক হয়। জাকি ভাইয়ের অফিসে বসানো মেইন ফ্রেমে ওরা নিশার গতিবিধি পরিষ্কার দেখতে পাবে এবং সেটা ফিল্ডের আস্কিং পারসনকে সারাক্ষণ জানিয়ে দিতে পারবে, যদি কেউ চায়।
বেড়িবাঁধ ধরে কিছুদূর গিয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনের বাউন্ডারি পার হয়ে আরেকটু সামনে গেল নিশা, এই জায়গাটার নাম বোধ হয় দিয়াবাড়ি। এখানেই একটা রেস্তোরাঁর প্রবেশমুখে গাড়িটা রেখে ওখানের দারোয়ানকে এক শ টাকা দিয়ে অনুরোধ করল একটু দেখে রাখার জন্য, আসলে পার্কিংটা কনফার্ম করল। তারপর আরও খানিকটা হেঁটে গিয়ে ডানদিকে একটা সরু পথ বেয়ে নামল। মোবাইলের পিনপয়েন্ট বলছে আর একটু সামনে যেতে হবে, গেল সে, যেতে থাকল। নির্দেশিত স্থানের কাছাকাছি একটা একতলা বাড়ির সঙ্গে কয়েকটা টিনের ঘর, গুদামের মতো। জায়গাটা পছন্দ হলো নিশার, এটাই হবে। কিন্তু ও যেমন ভেবেছিল, জায়গাটা তেমন সুরক্ষিত নয়। হয়তো নেহাতই একটা অস্থায়ী ঘাঁটি এটা।
মজার ব্যাপার হলো, জুনুনের ফোনটা একটু দূরের অবস্থান থেকে এখন আবার এখানে চলে এসেছে, সামান্য মুভ করছে। ধীরে। পাশের একটা ফাঁকা জায়গা পেরিয়ে পেছন দিক দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করল, যাওয়া যায় না। আবার সামনে চলে এল সে। মাঝবয়সী এক মহিলা কী যেন পোঁটলা-পাটলি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সে-ও চলল তার পিছু পিছু। হ্যাঁ, ওই পাশে একটা ডোবার ধার দিয়ে খোলা, কোনো বেড়া নাই। হালকা চালে এদিক-ওদিক চাইল নিশা, কাউকে তেমন চোখে পড়ল না। হয়তো কেউ দেখছে তাকে, তীক্ষ্ণ চোখে নজর রাখছে, কিন্তু...শ্রাগ করল নিশা, মরুকগে!—ভাবল সে। কিচ্ছু করার নাই, এখন তাকে মুখোমুখি হতেই হবে।
সে উঁকি দিল একটা ঘরের পাশ দিয়ে, মোট চারজন মানুষ দেখা যাচ্ছে, হয়তো আড়ালে আরও আছে। কিছু নিয়ে আলাপ করছে ওরা, যেন কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। ফতুয়ার নিচে কোমর থেকে সাইকেলের চেইনের ফুট খানেক লম্বা টুকরোটা বের করে হাতে পেঁচিয়ে নিল নিশা। জিনসের পকেটে চাপ দিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল পিস্তলটার অস্তিত্ব। উঁকি দিয়ে তাকিয়ে ওদের ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করে বোঝার চেষ্টা করছে মতলব। একটা টিনের চালায় অর্ধেক ঢোকানো একটা কাভার্ড ভ্যান, ওটার দিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে কী যেন বলল একজন। কী আছে ওতে? মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
এগিয়ে গিয়ে গাড়ির দরজাটা খুলল একজন, ভেতরটা দেখা যাচ্ছে না, পাল্লায় আড়াল হয়ে আছে।
হালকা সুরে ডেকে উঠল একটা পাখি, ‘বউ কথা কও’। শুনে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল নিশার, জাকি ভাই এসে গেছে!
ঝুঁকে দুই হাতে করে গাড়ি থেকে কিছু একটা বের করে আনছে সেই লোকটা, হঠাৎ মরণ চিৎকার দিয়ে সটান শুয়ে পড়ল সে। লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল জুনুন, হাতে একটা কাঠের টুকরো।
তীক্ষ্ণ স্বরে চিল চিৎকার দিয়ে ওদের ঠিক মাঝখানে লাফিয়ে পড়ল নিশা। হাঁ হয়ে যাওয়া মুখগুলো বন্ধ হওয়ার আগেই একজনের দুটো দাঁত খসে খসে পড়ল চেইন প্যাঁচানো হাতের ঘুষিতে, আর একজন চিৎ হয়ে পড়ল পাক খেয়ে আছড়ে পড়া নিশাকে বুকে নিয়ে—মাথা আর ঘাড়ে খুব ব্যথা পেল বেচারা। ওখান থেকে গড়ান খেয়ে আর একটার দিকে এগিয়ে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল নিশা, আর দরকার হবে না।
চারদিক থেকে বাঘের মতো খাপ পেতে এগিয়ে আসছে আট-দশজন পাথর যুবক, পেছনে বস—জাকি ভাই।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন